সংবাদ

ভারতের নতুন শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিচ্ছেন প্রলহাদ জোশী

প্রশ্নপত্র ফাঁস কেলেঙ্কারি এবং দেশজুড়ে নজিরবিহীন ছাত্র আন্দোলনের মুখে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর ভারতের নতুন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন প্রলহাদ জোশী।

৩০ বার পঠিত
ভারতের নতুন শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিচ্ছেন প্রলহাদ জোশী
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের বিশ্বস্ত ও অভিজ্ঞ এই জ্যেষ্ঠ নেতাকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গুরুদায়িত্ব দিয়ে মূলত আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও ক্ষুব্ধ নাগরিক সমাজকে আশ্বস্ত করার কৌশল নিয়েছে ক্ষমতাসীন দল। নতুন দায়িত্বে এসে প্রলহাদ জোশী পরীক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ, প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ এবং ভারতের বিপর্যস্ত শিক্ষা খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। এমন এক সংকটময় মুহূর্তে তিনি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করছেন, যখন দেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থী ও পরীক্ষার্থী কেন্দ্রীয় প্রবেশিকা পরীক্ষাগুলোর নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে গভীর সংশয়ে রয়েছে এবং রাজপথে বকেয়া দাবি আদায়ের আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে।

রাষ্ট্রপতি ভবনে অনুষ্ঠিত এক জরুরি বা সংক্ষিপ্ত সরকারি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এবং প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশক্রমে প্রলহাদ জোশীকে নতুন শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে মনোনীত করা হয়। এর আগে তিনি কেন্দ্রীয় সংসদীয় বিষয়াবলী, কয়লা ও খনি মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের দায়িত্ব দক্ষতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে সামলেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংসদীয় কার্যক্রমে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার সমন্বয়ী দক্ষতার কারণেই মোদি সরকার এই সংকটময় পরিস্থিতিতে তাঁর ওপর আস্থা রেখেছে। নতুন দায়িত্ব গ্রহণের পর সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় প্রলহাদ জোশী বলেন, দেশের তরুণ ও শিক্ষার্থীদের স্বার্থ সংরক্ষণই তাঁর প্রধান অগ্রাধিকার। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে, পরীক্ষা পদ্ধতির ওপর ছাত্রসমাজের হারিয়ে যাওয়া আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকার দ্রুততম সময়ে কার্যকর ও আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের বিতর্কিত বিদায়ের পরই মূলত নতুন শিক্ষামন্ত্রী নিয়োগের প্রক্রিয়াটি ত্বরান্বিত হয়। মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষা (NEET) ও ইউজিসি-নেটসহ (UGC-NET) একাধিক গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে দেশজুড়ে 'কাকরোচ জনতা পার্টি' ও অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের ব্যানারে যে গণবিক্ষোভ গড়ে ওঠে, তা সরকার তথা বিজেপিকে মারাত্মক ব্যাকফুটে ঠেলে দেয়। আন্দোলনের জের ধরে মন্ত্রীর পদত্যাগের পর নতুন মন্ত্রী হিসেবে প্রলহাদ জোশীর সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আন্দোলনকারীদের বাকি দাবিগুলোর সুরাহা করা। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ইতিমধ্যেই স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, কেবল মন্ত্রী পরিবর্তনই তাঁদের আন্দোলনের একমাত্র লক্ষ্য ছিল না; বরং প্রশ্নপত্র ফাঁসে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ প্রদান, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের প্রতিবাদ ও আন্দোলন কর্মসূচি সাময়িকভাবেও থমকে যাবে না।

নতুন শিক্ষামন্ত্রীকে তাই শুরুতেই এক বিশাল চ্যালেঞ্জ ও প্রশাসনিক সংস্কারের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। জাতীয় পরীক্ষা সংস্থা বা 'এনটিএ' (National Testing Agency)-এর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং পরীক্ষা পরিচালনায় আমূল সংস্কার আনা এখন প্রলহাদ জোশীর প্রধান কাজ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রশাসনিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন থেকে শুরু করে ফলাফল প্রকাশ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে সর্বোচ্চ মানের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করছেন নতুন মন্ত্রী। একই সঙ্গে পরীক্ষা পরিচালনায় নিয়োজিত বেসরকারি কোনো সংস্থাকে যাতে অন্যায্য সুযোগ বা গোপন তথ্য ব্যবহারের সুযোগ না দেওয়া হয়, সে বিষয়ে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মনিটরিং সেল গঠনের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।

প্রলহাদ জোশীর এই রাজনৈতিক পথচলা ভারতের বর্তমান সংসদীয় রাজনীতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কর্ণাটকের ধারওয়াদ লোকসভা কেন্দ্র থেকে একাধিকবার নির্বাচিত এই অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান তাঁর শান্ত ও কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতার জন্য পরিচিত। এর আগে সংসদীয় বিষয়াবলী মন্ত্রী থাকাকালে বিরোধী দলের নানা ক্ষোভের মুখেও আইনসভার কার্যক্রম পরিচালনা করার ক্ষেত্রে তিনি বেশ বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছিলেন। তবে একটি রাজপথের বিশাল আন্দোলন ও লক্ষ কোটি তরুণের ক্ষোভ প্রশমন করা তাঁর পূর্বের যেকোনো রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের চেয়ে আলাদা বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। শিক্ষাবিদদের একাংশ মনে করেন, কেবল প্রতিশ্রুতির রাজনীতি দিয়ে শিক্ষার্থীদের শান্ত করা সম্ভব নয়, বরং দৃশ্যমান আইন ও কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে সততা ও স্বচ্ছতা প্রমাণ করতে হবে।

ভারতের প্রধান বিরোধী দলগুলো ইতিমধ্যেই প্রলহাদ জোশীর নিয়োগ নিয়ে সতর্ক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। বিরোধী শিবিরের নেতাদের দাবি, ব্যক্তি পরিবর্তন নয়, বরং মোদি সরকারের আমলাতান্ত্রিক মানসিকতা ও শিক্ষাক্ষেত্রে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের মনোভাবের পরিবর্তন ঘটাতে হবে। তারা শিক্ষা ব্যবস্থাকে সুসংগঠিত করা এবং দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে। অন্যদিকে শাসকদল বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব আশা প্রকাশ করছে যে, প্রলহাদ জোশীর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও কৌশলগত পদক্ষেপে রাজপথের চলমান অসন্তোষ দ্রুত প্রশমিত হবে এবং ভারতের শিক্ষাব্যবস্থায় স্বাভাবিক পরিবেশ ও স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে। সব মিলিয়ে, ভারতের নতুন শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে প্রলহাদ জোশীর সামনের দিনগুলো অত্যন্ত নাটকীয় ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ হতে যাচ্ছে, যার ওপর নির্ভর করছে ভারতের ভবিষ্যতের কোটি কোটি শিক্ষার্থীর ভাগ্য।