অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

স্পাইওয়্যার নজরদারির মামলা চলার অনুমতি কি বিশ্বব্যাপী নজির স্থাপন করবে?

যুক্তরাজ্যে বসবাসরত দুইজন বাহরাইনি ভিন্নমতাবলম্বী ও রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিস্টের ওপর বেআইনিভাবে স্পাইওয়্যার ব্যবহার করে নজরদারি চালানোর অভিযোগে করা মামলা বন্ধের জন্য বাহরাইন সরকারের করা আপিল আবেদনটি সরাসরি খারিজ করে দিয়েছেন ব্রিটেনের সুপ্রিম কোর্ট।

২৫ বার পঠিত
স্পাইওয়্যার নজরদারির মামলা চলার অনুমতি কি বিশ্বব্যাপী নজির স্থাপন করবে?
সোমবার (২৭ জুলাই ২০২৬) সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের ৩-২ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ঐতিহাসিক এক রায়ে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়। আদালতের এই রায়ের ফলে এটি নিশ্চিত হলো যে, বিদেশের মাটিতে বসে যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী কোনো নাগরিকের ওপর স্পাইওয়্যার বা সাইবার নজরদারি চালালেও সংশ্লিষ্ট বিদেশি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যের আদালতে মামলা চালানো সম্ভব এবং রাষ্ট্রীয় দায়মুক্তির (State Immunity) অজুহাতে সেই আইনি পদক্ষেপ আটকানো যাবে না।

মামলার বিবরণ ও মূল অভিযোগ বিশ্লেষণ করে জানা যায়, এই আইনি লড়াইটির সূচনা করেছিলেন যুক্তরাজ্যে নির্বাসিত বাহরাইনের রাজনৈতিক দল ‘হক মুভমেন্ট’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সাঈদ শেহাবি এবং অপর বাহরাইনি শরণার্থী ও মানবাধিকারকর্মী মুসা মোহাম্মদ। ২০২০ সালে লন্ডনের হাইকোর্টে দায়ের করা ওই মামলায় তারা অভিযোগ করেন, ২০১১ সাল থেকে বাহরাইন সরকার বা এর নিয়ন্ত্রিত সংস্থাগুলো ‘ফিনস্পাই’ (FinSpy) নামক একটি বিপজ্জনক স্পাইওয়্যার ব্যবহার করে গোপনে তাদের ব্যক্তিগত কম্পিউটারে অনুপ্রবেশ করে। এই স্পাইওয়্যারের মাধ্যমে দীর্ঘ সময় ধরে তাদের কি-স্ট্রোক রেকর্ড, শারীরিক অবস্থান ট্র্যাকিং এবং ব্যক্তিগত সমস্ত কর্মকাণ্ড দূর থেকে মনিটর করা হতো। ক্রমাগত এই অনৈতিক ও বেআইনি সাইবার নজরদারির কারণে তারা মারাত্মক মানসিক ট্রমা ও স্বাস্থ্যগত ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন দাবি করে তারা যৌথভাবে ক্ষতিপূরণের আবেদন জানান।

আইনি প্রক্রিয়ার প্রেক্ষাপটে বাহরাইন সরকার শুরু থেকেই এই হ্যাকিংয়ের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিল। একই সাথে মানামা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জোর যুক্তি দেওয়া হয়েছিল যে, যেহেতু কথিত হ্যাকিংয়ের মূল কর্মকাণ্ড বা কমান্ড বাহরাইনের ভূখণ্ড থেকে পরিচালিত হয়েছিল, তাই আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আইন অনুযায়ী তারা ‘রাষ্ট্রীয় দায়মুক্তি’ বা সার্বভৌম ক্ষমতার সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারী। ফলে ব্রিটিশ আদালত এই মামলার বিচার করতে পারে না বলেও বাহরাইন দাবি করে। তবে সুপ্রিম কোর্ট তাদের সর্বশেষ পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, যেহেতু ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি এবং তাদের কম্পিউটার ডিভাইসসমূহ হামলার সময়ে যুক্তরাজ্যের ভূখণ্ডে ছিল এবং স্পাইওয়্যারটির ক্ষতিকর প্রভাবও যুক্তরাজ্যেই প্রতিফলিত হয়েছে, তাই এটিকে ব্রিটেনের ভূখণ্ডেই সংঘটিত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এর আগে ২০২৩ সালে লন্ডনের হাইকোর্ট এবং ২০২৪ সালে আপিল বিভাগ বাহরাইনের এই যুক্তি খারিজ করে দিলে তারা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেছিল, যা এবার চূড়ান্তভাবে প্রত্যাখ্যাত হলো।

বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সার্বভৌম রাষ্ট্র এবং বাণিজ্যিক স্পাইওয়্যার তৈরি করা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীদের আইনি লড়াইয়ের ইতিহাসে ব্রিটেনের সুপ্রিম কোর্টের এই সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মাইলফলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা। সাম্প্রতিক সময়ে হোয়াটসঅ্যাপ কর্তৃক ইসরায়েলি সংস্থা এনএসও গ্রুপের (NSO Group) 'পেগাসাস' স্পাইওয়্যারের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে চলমান মামলার পাশাপাশি এই সিদ্ধান্তটি আন্তর্জাতিক মহলে এক নতুন আইনি নজির স্থাপন করল। দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বাহরাইন সরকারের বিরুদ্ধে ভিন্নমত দমন, বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী, সাংবাদিক ও অধিকারকর্মীদের মোবাইল এবং কম্পিউটারে আড়িপাতার অভিযোগ তুলে আসছিল। আদালতের এই রায়ের পর এখন লন্ডনের হাইকোর্টে মূল মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার ও শুনানি কার্যক্রম শুরু হতে আর কোনো আইনি বাধা রইল না, যা ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক সাইবার নজরদারি এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার আইনি লড়াইয়ে এক নতুন দিক উন্মোচন করবে।