পরিবেশ ও জলবায়ু

জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন হুমকিতে ফিলিপাইনের ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ ধান ক্ষেত

জলবায়ু পরিবর্তনের চরম প্রভাব ও সরকারি অপ্রতুল অর্থায়নের কারণে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে ফিলিপাইনের ঐতিহাসিক ও চোখজুড়ানো 'ইফুফাও ধান ক্ষেত' (Ifugao Rice Terraces)।

২১ বার পঠিত
জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন হুমকিতে ফিলিপাইনের ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ ধান ক্ষেত
শত শত বছরের পুরনো প্রাচীন প্রকৌশল ও ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে টিকে থাকা এই ধাপবিশিষ্ট ধান ক্ষেতগুলো সাম্প্রতিক সময়ের ঘন ঘন ভূমিধস, দীর্ঘায়িত খরা এবং আকস্মিক অতিবৃষ্টির ফলে চরম ঝুঁকিতে পড়েছে। ১৯৯৫ সালে ইউনেস্কো (UNESCO) কর্তৃক বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া এই স্থানে বসবাসকারী 'ইফুফাও' জনগোষ্ঠীর মানুষেরা ঐতিহ্যের এমন ক্ষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইফুফাও প্রদেশের বাতাদ (Batad) গ্রামের এই ঐতিহ্যবাহী ধান ক্ষেতে গত বছরের নভেম্বরে শক্তিশালী টাইফুন 'ফং-ওং' (Super Typhoon Fung-wong)-এর আঘাতে মারাত্মক ভূমিধস ঘটে। ওই দুর্ঘটনায় দুজন স্থানীয় বাসিন্দা প্রাণ হারান এবং শতবর্ষী সেচ খাল বিধ্বস্ত হয়। এতে প্রায় ২.২ হেক্টর ধান ক্ষেত ধ্বংস হয়ে ১৫০ জন কৃষক সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হন। তবে এটিই প্রথম নয়; এর আগে ২০১১, ২০২৩ এবং সম্প্রতি ২০২৫ সালেও এলাকাটিতে একাধিক ভূমিধস ঘটে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চলতি বছরের সম্ভাব্য 'সুপার এল নিনো' (Super El Niño) আবহাওয়া পরিস্থিতির কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং চরম বৃষ্টিপাত ও খরার প্রকোপ বেড়ে চলেছে। 'সেভ দ্য ইফুফাও টেরেসস মুভমেন্ট' (SITMO)-এর প্রধান আইনজীবী মার্লন মার্টিন জানান, পাহাড়ের ধাপে ধাপে তৈরি এসব ক্ষেত স্থির রাখতে মাটিতে সারা বছর নির্দিষ্ট মাত্রার আর্দ্রতা থাকা আবশ্যক। কিন্তু সাম্প্রতিক খরা ও অনাবৃষ্টির কারণে মাটিতে বড় বড় ফাটল তৈরি হচ্ছে। পরবর্তীতে হঠাৎ ভারী বৃষ্টিপাত হলে পানি ওই ফাটলগুলোতে প্রবেশ করে ভূমিধস ও মাটি ধসে যাওয়ার গতি কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বিশ্বব্যাপী প্রাকৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা নিয়ে সায়েন্টিফিক জার্নাল নেচার (Nature)-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ইউনেস্কোর প্রায় ৮০ শতাংশ বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান জলবায়ু পরিবর্তনজনিত চাপের মধ্যে রয়েছে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে অবস্থিত এসব ঐতিহ্য রক্ষায় সবচেয়ে কম সরকারি ও আন্তর্জাতিক সহায়তা পাওয়া যায়, যা অঞ্চলগুলোকে চরম আবহাওয়ার সামনে আরও অসহায় করে তোলে।

বাতাদ গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত সেচ খাল পুনঃনির্মাণে প্রায় ৫ লাখ মার্কিন ডলারের সহায়তা প্রয়োজন। তবে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফ থেকে প্রয়োজনীয় বাজেট ছাড় পেতে দীর্ঘ সময় বিলম্ব হচ্ছে। ফলে ইফুফাও সম্প্রদায়ের মানুষেরা নিজেদের ঐতিহ্য ও জীবিকা বাঁচাতে 'বাচাং' (Bachang) নামের ঐতিহ্যবাহী স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে নিজস্ব উদ্যোগে খালের সংস্কার কাজ চালাচ্ছেন। স্থানীয় প্রতিনিধি ও কৃষকরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, কেবল স্থানীয় বা ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি দিয়ে এই তীব্র জলবায়ু সংকট মোকাবেলা সম্ভব নয়; ইউনেস্কোর এই ঐতিহ্য রক্ষায় সরকারের দ্রুত ও স্থায়ী অর্থায়ন জরুরি।