আন্তর্জাতিক
হরমুজ প্রণালীকে প্রধান দরকষাকষির হাতিয়ার বানাচ্ছে তেহরান
মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার নতুন তরঙ্গের মধ্যে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ 'হরমুজ প্রণালী'কে নিজেদের সবচেয়ে শক্তিশালী কৌশলগত দরকষাকষির হাতিয়ার বা 'বার্গেইনিং চিপ' হিসেবে ব্যবহার করছে ইরান।
আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের সাথে যেকোনো ভবিষ্যৎ কিংবা সম্ভাব্য চুক্তিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে তেহরান কেবল নৌ-চলাচল স্বাভাবিক করার বিষয়টিকে পৃথকভাবে দেখতে রাজি নয়। বরং ওয়াশিংটনের সাথে তাদের মূল নিরাপত্তা উদ্বেগ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং পারমাণবিক কর্মসূচির মতো দীর্ঘমেয়াদী ও বৃহৎ সংকটগুলোর সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত ইরান হরমুজ প্রণালীর ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ ও তৈরি করা চাপকে হাতছাড়া করবে না। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে যুক্তরাজ্যের বাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ সহযোগী অধ্যাপক প্যাট্রিক বুরি এমনটাই জানিয়েছেন। সামরিক ও ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করে তিনি উল্লেখ করেন, ইরানি নীতিনির্ধারকেরা খুব ভালো করেই অনুধাবন করতে পেরেছেন যে এই সংকটে তাদের হাতে অত্যন্ত শক্তিশালী একটি কৌশলগত সুবিধা বা 'লেভার' রয়েছে, যার মাধ্যমে তারা আঞ্চলিক ও বিশ্ব অর্থনীতিতে মার্কিন মিত্রদের ওপর তুলনামূলক কম খরচে অস্বাভাবিক মাত্রায় সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম।
উপসাগরীয় অঞ্চলে জ্বালানি নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ এবং মার্কিন-ইরান বৈরী সম্পর্কের বর্তমান গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, হরমুজ প্রণালী এখন আর সাধারণ কোনো বাণিজ্যিক সমুদ্রপথের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী এই সংকীর্ণ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের মোট ব্যবহৃত অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে সাময়িক অবরোধ বা যেকোনো ধরনের নৌ-অস্থিতিশীলতা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নিমেষেই বড় ধরণের ঝোড়ো হাওয়া তৈরি করে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের চড়া মূল্য, জাহাজ চলাচলে অনিশ্চয়তা, সমুদ্রবীমার আকাশচুম্বী ব্যয় এবং বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা—এই প্রতিটি উপাদানকেই তেহরান তাদের নিজেদের পক্ষে অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি হিসেবে কাজে লাগাচ্ছ। নিরাপত্তা বিশ্লেষক প্যাট্রিক বুরির মতে, যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমা জোটের বিশাল সামরিক বহর এবং বিধ্বংসী প্রযুক্তির বিপরীতে ইরানের মূল শক্তি দাঁড়িয়ে আছে 'অ্যাসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ার' বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ সামরিক ক্ষমতার ওপর। স্বল্প ব্যয়ে ড্রোন, গাইডেড মিসাইল, ড্রোন বোট ও দ্রুতগামী স্পিডবোটের সাহায্যে বাণিজ্যিক ট্যাঙ্কার ও নৌ-চলাচলে বিঘ্ন ঘটিয়ে ইরান যে পরিমাণের অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি ওয়াশিংটন ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর চাপিয়ে দিতে পারে, তা মোকাবিলা করার ব্যয় বহুগুণ বেশি। এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রভাবকে কাজে লাগিয়েই তেহরান নিশ্চিত করতে চায় যে, যেকোনো কূটনৈতিক টেবিলে হরমুজকে কেবল একটি বিচ্ছিন্ন নৌ-নিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে নয়, বরং সার্বিক ভূ-রাজনৈতিক দরকষাকষির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হোক।
ঐতিহাসিকভাবে পারস্য উপসাগরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ক্ষমতার দ্বৈরথ দীর্ঘদিনের হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষ করে পারমাণবিক সমঝোতা বা জেসিপিওএ ভেস্তে যাওয়ার পর থেকে এই কৌশলগত প্রতিযোগিতা চরম আকার ধারণ করেছে। অতীতে ইরান মূলত প্রতিরক্ষামূলক কৌশল হিসেবে হরমুজ প্রণালী বন্ধের হুমকি দিলেও বর্তমান সংকটে তেহরান দৃশ্যমানভাবে সেই হুমকিকে বাস্তবে প্রয়োগ করে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে সাম্প্রতিক সামরিক সঙ্ঘাত এবং বিমান হামলার পর ওয়াশিংটনের তরফ থেকে বাণিজ্য বা সামরিক চাপ সৃষ্টির চেষ্টার জবাবে ইরান হরমুজে নিজেদের কর্তৃত্ব ও কঠোর তদারকি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন নেতৃত্বাধীন মিত্র জোট হরমুজ প্রণালীকে বাইপাস করে ওমানের আঞ্চলিক পানিসীমা দিয়ে বিকল্প নৌ-রুট চালু করা কিংবা মিত্র দেশগুলোর সমন্বয়ে নৌ-সংগঠন তৈরির চেষ্টা করলেও তেহরান স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, তাদের নিজস্ব সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ ও অনুমতি ব্যতি রেখে কোনো পৃথক বা সমান্তরাল নৌ-ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে এই অঞ্চলে শান্তি ফেরানো সম্ভব হবে না। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এবং পেন্টাগন যখন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে প্রণালীটি পুরোপুরি উন্মুক্ত করার তাগিদ দিচ্ছে, তখন ইরানের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব এটিকে তাদের 'গোল্ডেন ওয়েপন' বা সোনালী অস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করছে, যা তারা পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ত্যাগ করতে নারায়।
কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশ্ব রাজনীতির পর্যবেক্ষকেরা মনে করছেন যে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কিংবা সাময়িক সামরিক স্থগিতাদেশ অত্যন্ত নাজুক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জর্ডান ও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে সাম্প্রতিক পাল্টা আক্রমণ এবং তার জবাবে মার্কিন প্রশাসনের কঠোর সামরিক ব্যবস্থার হুমকির মুখে স্থায়ী সমাধানের পথ আরও জটিল হয়ে পড়েছে। ইরানি কূটনীতিকদের ভাষ্য এবং শীর্ষ আঞ্চলিক বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, তেহরানের ভেতরে এই দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত দৃঢ় হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের বাইডেন বা ট্রাম্প—যেকোনো প্রশাসনের সাথে স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছাতে হলে হরমুজ প্রণালীর নমনীয়তাকে শর্তহীনভাবে ব্যবহার করা যাবে না। ইরান এই কৌশলগত সুবিধা কেবল তখনই ছেড়ে দেবে, যখন যুক্তরাষ্ট্র দেশটির ওপর আরোপিত সমস্ত কঠিন অর্থনৈতিক ও তেল বিক্রির নিষেধাজ্ঞা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করবে এবং আন্তর্জাতিক স্তরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও স্বাতন্ত্র্যের আইনি স্বীকৃতি প্রদান করবে। ফলে স্বল্পমেয়াদে হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে সম্পূর্ণ স্বাভাবিকতা ফিরে আসার সম্ভাবনা বেশ কম; বরং শর্তাধীন চলাচল, সাময়িক বিঘ্ন এবং কূটনৈতিক দরকষাকষির মধ্য দিয়েই পরিচালিত হবে বৈশ্বিক জ্বালানি খাতের এই অন্যতম প্রাণকেন্দ্র।
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যকার এই ত্রিপক্ষীয় ও আন্তর্জাতিক মেরুকরণ দীর্ঘমেয়াদে বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতিকে এক নতুন বাস্তবতা বা 'নিউ নরমাল'-এর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। চীন, ভারত এবং ইউরোপীয় দেশগুলো—যারা মূলত এই পথ দিয়ে আসা তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল—তারা ইতিমধ্যেই উত্তেজনা প্রশমন ও বহু পাক্ষিক কূটনীতির ওপর জোর দিচ্ছে। কিন্তু অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি হ্রাস ও অঞ্চলটিতে একটি নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার ইরানি আকাঙ্ক্ষা হরমুজ সংকটের পরিধিকে বহু দূরে বিস্তৃত করেছে। সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালী এখন আর শুধুই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও তেল সরবরাহের একটি চোকপয়েন্ট নয়; বরং এটি পরিণত হয়েছে আন্তর্জাতিক রাজনীতির সবচেয়ে সংবেদনশীল শক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে, যা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তেহরান পুরো বিশ্বকে তাদের সামরিক ও অর্থনৈতিক শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করার কৌশল চালিয়ে যাচ্ছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে জ্বালানি নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ এবং মার্কিন-ইরান বৈরী সম্পর্কের বর্তমান গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, হরমুজ প্রণালী এখন আর সাধারণ কোনো বাণিজ্যিক সমুদ্রপথের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী এই সংকীর্ণ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের মোট ব্যবহৃত অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে সাময়িক অবরোধ বা যেকোনো ধরনের নৌ-অস্থিতিশীলতা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নিমেষেই বড় ধরণের ঝোড়ো হাওয়া তৈরি করে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের চড়া মূল্য, জাহাজ চলাচলে অনিশ্চয়তা, সমুদ্রবীমার আকাশচুম্বী ব্যয় এবং বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা—এই প্রতিটি উপাদানকেই তেহরান তাদের নিজেদের পক্ষে অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি হিসেবে কাজে লাগাচ্ছ। নিরাপত্তা বিশ্লেষক প্যাট্রিক বুরির মতে, যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমা জোটের বিশাল সামরিক বহর এবং বিধ্বংসী প্রযুক্তির বিপরীতে ইরানের মূল শক্তি দাঁড়িয়ে আছে 'অ্যাসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ার' বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ সামরিক ক্ষমতার ওপর। স্বল্প ব্যয়ে ড্রোন, গাইডেড মিসাইল, ড্রোন বোট ও দ্রুতগামী স্পিডবোটের সাহায্যে বাণিজ্যিক ট্যাঙ্কার ও নৌ-চলাচলে বিঘ্ন ঘটিয়ে ইরান যে পরিমাণের অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি ওয়াশিংটন ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর চাপিয়ে দিতে পারে, তা মোকাবিলা করার ব্যয় বহুগুণ বেশি। এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রভাবকে কাজে লাগিয়েই তেহরান নিশ্চিত করতে চায় যে, যেকোনো কূটনৈতিক টেবিলে হরমুজকে কেবল একটি বিচ্ছিন্ন নৌ-নিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে নয়, বরং সার্বিক ভূ-রাজনৈতিক দরকষাকষির অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হোক।
ঐতিহাসিকভাবে পারস্য উপসাগরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ক্ষমতার দ্বৈরথ দীর্ঘদিনের হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষ করে পারমাণবিক সমঝোতা বা জেসিপিওএ ভেস্তে যাওয়ার পর থেকে এই কৌশলগত প্রতিযোগিতা চরম আকার ধারণ করেছে। অতীতে ইরান মূলত প্রতিরক্ষামূলক কৌশল হিসেবে হরমুজ প্রণালী বন্ধের হুমকি দিলেও বর্তমান সংকটে তেহরান দৃশ্যমানভাবে সেই হুমকিকে বাস্তবে প্রয়োগ করে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে সাম্প্রতিক সামরিক সঙ্ঘাত এবং বিমান হামলার পর ওয়াশিংটনের তরফ থেকে বাণিজ্য বা সামরিক চাপ সৃষ্টির চেষ্টার জবাবে ইরান হরমুজে নিজেদের কর্তৃত্ব ও কঠোর তদারকি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন নেতৃত্বাধীন মিত্র জোট হরমুজ প্রণালীকে বাইপাস করে ওমানের আঞ্চলিক পানিসীমা দিয়ে বিকল্প নৌ-রুট চালু করা কিংবা মিত্র দেশগুলোর সমন্বয়ে নৌ-সংগঠন তৈরির চেষ্টা করলেও তেহরান স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, তাদের নিজস্ব সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ ও অনুমতি ব্যতি রেখে কোনো পৃথক বা সমান্তরাল নৌ-ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে এই অঞ্চলে শান্তি ফেরানো সম্ভব হবে না। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এবং পেন্টাগন যখন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে প্রণালীটি পুরোপুরি উন্মুক্ত করার তাগিদ দিচ্ছে, তখন ইরানের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব এটিকে তাদের 'গোল্ডেন ওয়েপন' বা সোনালী অস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করছে, যা তারা পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ত্যাগ করতে নারায়।
কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশ্ব রাজনীতির পর্যবেক্ষকেরা মনে করছেন যে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কিংবা সাময়িক সামরিক স্থগিতাদেশ অত্যন্ত নাজুক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জর্ডান ও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে সাম্প্রতিক পাল্টা আক্রমণ এবং তার জবাবে মার্কিন প্রশাসনের কঠোর সামরিক ব্যবস্থার হুমকির মুখে স্থায়ী সমাধানের পথ আরও জটিল হয়ে পড়েছে। ইরানি কূটনীতিকদের ভাষ্য এবং শীর্ষ আঞ্চলিক বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, তেহরানের ভেতরে এই দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত দৃঢ় হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের বাইডেন বা ট্রাম্প—যেকোনো প্রশাসনের সাথে স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছাতে হলে হরমুজ প্রণালীর নমনীয়তাকে শর্তহীনভাবে ব্যবহার করা যাবে না। ইরান এই কৌশলগত সুবিধা কেবল তখনই ছেড়ে দেবে, যখন যুক্তরাষ্ট্র দেশটির ওপর আরোপিত সমস্ত কঠিন অর্থনৈতিক ও তেল বিক্রির নিষেধাজ্ঞা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করবে এবং আন্তর্জাতিক স্তরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও স্বাতন্ত্র্যের আইনি স্বীকৃতি প্রদান করবে। ফলে স্বল্পমেয়াদে হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে সম্পূর্ণ স্বাভাবিকতা ফিরে আসার সম্ভাবনা বেশ কম; বরং শর্তাধীন চলাচল, সাময়িক বিঘ্ন এবং কূটনৈতিক দরকষাকষির মধ্য দিয়েই পরিচালিত হবে বৈশ্বিক জ্বালানি খাতের এই অন্যতম প্রাণকেন্দ্র।
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যকার এই ত্রিপক্ষীয় ও আন্তর্জাতিক মেরুকরণ দীর্ঘমেয়াদে বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতিকে এক নতুন বাস্তবতা বা 'নিউ নরমাল'-এর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। চীন, ভারত এবং ইউরোপীয় দেশগুলো—যারা মূলত এই পথ দিয়ে আসা তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল—তারা ইতিমধ্যেই উত্তেজনা প্রশমন ও বহু পাক্ষিক কূটনীতির ওপর জোর দিচ্ছে। কিন্তু অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি হ্রাস ও অঞ্চলটিতে একটি নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার ইরানি আকাঙ্ক্ষা হরমুজ সংকটের পরিধিকে বহু দূরে বিস্তৃত করেছে। সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালী এখন আর শুধুই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও তেল সরবরাহের একটি চোকপয়েন্ট নয়; বরং এটি পরিণত হয়েছে আন্তর্জাতিক রাজনীতির সবচেয়ে সংবেদনশীল শক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে, যা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তেহরান পুরো বিশ্বকে তাদের সামরিক ও অর্থনৈতিক শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করার কৌশল চালিয়ে যাচ্ছে।