খেলা ও বিনেদন

ট্রফির বদলে জ্যান্ত ছাগল! আদিবাসীদের এক ভিন্নধর্মী ফুটবল টুর্নামেন্ট

বিশ্বজুড়ে যখন ফুটবলের উন্মাদনা, তখন ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্যের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে ফুটবল জ্বরের ভিন্ন এক চিত্র দেখা গেল।

১১ বার পঠিত
ট্রফির বদলে জ্যান্ত ছাগল! আদিবাসীদের এক ভিন্নধর্মী ফুটবল টুর্নামেন্ট
স্পেনের ফিফা বিশ্বকাপ জয় এবং বিশ্ব ফুটবলের "গোট" (GOAT - Greatest Of All Time) খেতাব নিয়ে যখন সারা বিশ্বের ক্রীড়াপ্রেমীদের মধ্যে তর্কবিতর্ক ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড়, ঠিক তখনই ভারতের আদিবাসী অধ্যুষিত চাইবাসায় দেখা মিলল আক্ষরিক অর্থেই 'গোট' বা ছাগল নিয়ে এক ব্যতিক্রমী উন্মাদনা। সেখানে চকচকে মেডেল বা ট্রফির বদলে বিজয়ী ফুটবল দলের হাতে তুলে দেওয়া হয় জ্যান্ত ছাগল। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই চমকপ্রদ টুর্নামেন্টের খবর, যেখানে ফুটবল শুধুই কোনো আধুনিক প্রতিযোগিতামূলক খেলা নয়, বরং একটি গ্রামীণ সম্প্রদায়ের ঐক্যের অনবদ্য উৎসব।

ঝাড়খণ্ডের পূর্ব ভারতের একটি আদিবাসী অধ্যুষিত জেলা চাইবাসা। এই জেলার অন্তর্গত তিরিলবাসা গ্রামে গত ১৪ জুলাই থেকে ১৭ জুলাই পর্যন্ত আয়োজিত হয়েছিল এক অভিনব ফুটবল প্রতিযোগিতা। টুর্নামেন্টের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘রঙ্গিলা স্টার তিরিলবাসা’ (Rangila Star Tirilbasa)। 'রঙ্গিলা' শব্দের অর্থ রঙিন, আর এই টুর্নামেন্টের চিত্রও ছিল নামের মতোই প্রাণবন্ত, উৎসবমুখর ও রঙিন। ফিফা বিশ্বকাপের ডামাডোলের মাঝেই আয়োজিত এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিল আশেপাশের প্রায় ৬৪টি গ্রামের ফুটবল দল। তবে এই টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ কেবল মাঠের ফুটবল শৈলী বা আর্থিক পুরস্কারের অংক ছিল না। এর প্রধান আকর্ষণ ছিল টুর্নামেন্টের ট্রফি! কারণ আয়োজকরা সেরা দলগুলোর জন্য গতানুগতিক কোনো ধাতব ট্রফি বা কাপ রাখেননি, বরং তার বদলে পুরস্কার হিসেবে রাখা হয়েছিল একপাল জ্যান্ত ছাগল।

টুর্নামেন্টের ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল স্থানীয় দুটি শক্তিশালী দল—‘এনসিএস মাউডি’ (NCS Maudi) এবং ‘কুম্বারাম’ (Kumbaram)। অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এক ফাইনালে এনসিএস মাউডি ১-০ গোলে কুম্বারামকে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে। অবাক করা বিষয় হলো, এই ম্যাচের মাত্র দুই দিন পরেই নিউইয়র্কে ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেন ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার ম্যাচেও ঠিক একই রকম উত্তেজনাপূর্ণ ১-০ গোলের ফলাফল দেখা যায়। চ্যাম্পিয়ন দল এনসিএস মাউডি ট্রফি হিসেবে ঘরে তোলে ১৫ হাজার রুপি (প্রায় ১৫৬ মার্কিন ডলার) এবং তিনটি বড় পুরুষ ছাগল, স্থানীয় ভাষায় যাদের 'খাসি' (Khassi) বলা হয়। অন্যদিকে, রানার্সআপ কুম্বারাম পায় ১২ হাজার রুপি (১২৫ ডলার) এবং দুটি খাসি। এছাড়া টুর্নামেন্টে তৃতীয় ও চতুর্থ স্থান অধিকারী ‘কোবরা এফসি নিমধি’ এবং ‘গালুবাসা এফসি’ প্রত্যেকে ৯ হাজার রুপি ও একটি করে খাসি লাভ করে।

পুরস্কার হিসেবে কেন এই জ্যান্ত ছাগল বা খাসি দেওয়া হয়, তার নেপথ্যে রয়েছে এই অঞ্চলের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও সম্প্রদায়ের নিজস্ব সংস্কৃতি। আধুনিক স্পোর্টস নিউজ বা আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টগুলোতে সাধারণত মিলিয়ন ডলারের পুরস্কার, গোল্ড মেডেল বা ট্রফি দেওয়া হলেও, চাইবাসার এই আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে ফুটবল ও ভ্রাতৃত্ববোধ একই সূত্রে গাঁথা। এই এলাকার মানুষেরা মূলত ‘হো’ (Ho) সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। তাদের আদিবাসী ভাষায় ‘হো’ শব্দের অর্থ হলো কোলহান অঞ্চলের মানুষ বা মানব জাতি। ভারতের অন্যতম বৃহত্তম কয়লা ও খনিজ সম্পদের খনি এই ঝাড়খণ্ডে অবস্থিত হলেও, এখানকার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আজও চরম দারিদ্র্যের সাথেই লড়ছে। সম্পদের প্রাচুর্য থাকলেও তার সুফল এই প্রান্তিক মানুষগুলোর কাছে খুব একটা পৌঁছায় না। তবে অর্থনৈতিক অভাব তাদের উৎসব বা আনন্দের পথে কখনো বাধা হতে পারেনি।

টুর্নামেন্টের অন্যতম আয়োজক এবং ১৮ বছর বয়সী তরুণ খেলোয়াড় মনীশ কুদাদা আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, খাসি বা ছাগল তাদের সংস্কৃতির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। তিনি বলেন, “ফুটবল আমাদের কাছে শুধু একটা খেলা নয়, এটা পুরো গ্রামের মানুষের এক হওয়ার একটা উপলক্ষ। আমরা তাই পুরস্কার হিসেবে নগদ অর্থের পাশাপাশি ছাগল দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। খেলোয়াড়রা নগদ অর্থ নিজেদের কাছে রাখতে পারে বা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিতে পারে, কিন্তু এই খাসিগুলোর মাধ্যমে তারা পুরো গ্রামের মানুষের সাথে নিজেদের বিজয় উদযাপন করার সুযোগ পায়।” অর্থাৎ, ট্রফি শুধু একজন অধিনায়কের হাতে উঠে বা কোনো ক্লাবের কাঁচের শোকেসে বন্দী না থেকে, এই ছাগলগুলো পুরো গ্রামের মানুষের জন্য এক বিশাল ভোজ বা উৎসবের মাধ্যম হয়ে ওঠে। অধিকাংশ বিজয়ী দলই পুরস্কার হিসেবে পাওয়া এই ছাগলগুলো দিয়ে গ্রামে বিশাল ভোজে মেতে ওঠে এবং সবার সাথে আনন্দ ভাগ করে নেয়, যদিও কেউ কেউ আবার এগুলোকে ভবিষ্যতের সম্পদ হিসেবেও লালনপালন করে থাকে।

এই ব্যতিক্রমী প্রথাটি শুধু পুরস্কার বিতরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি তাদের নিজস্ব সমাজকাঠামো, শাসনব্যবস্থা ও জীবনধারারও এক অনন্য প্রতীক। ‘হো’ সম্প্রদায়ের লোকেরা মূলত ‘মুন্ডা-মানকি’ (Munda-Manki) শাসনব্যবস্থা মেনে চলে। এই প্রথাগত ব্যবস্থায় গ্রামের একজন বংশানুক্রমিক প্রধান বা সর্দার থাকেন, যিনি গ্রামের সমস্ত সামাজিক, আইনি ও প্রথাগত অধিকারগুলো রক্ষা করেন। তাদের এই উপজাতীয় আইন, রীতিনীতি ও সামাজিক প্রথাগুলো অনেক ক্ষেত্রেই ভারতীয় সরকারের প্রচলিত পঞ্চায়েত ব্যবস্থা বা পুলিশি ব্যবস্থার চেয়েও বেশি শক্তিশালী এবং স্থানীয়দের কাছে অধিক গ্রহণযোগ্য। তাই একটি ফুটবল টুর্নামেন্টেও তাদের এই নিজস্ব সংস্কৃতি, সাম্যবাদ ও জীবনবোধের ছায়া খুব স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।

ফুটবলকে কেন্দ্র করে এমন আয়োজন প্রমাণ করে যে, খেলাধুলা কেবল জয়-পরাজয়ের সমীকরণ বা ব্যবসা নয়; এটি সমাজে ভ্রাতৃত্ব, আনন্দ এবং সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটানোর এক শক্তিশালী মাধ্যম। আধুনিক বিশ্বের কর্পোরেট ফুটবলের যুগে, যেখানে বিলিয়ন ডলারের স্পন্সরশিপ চুক্তি আর ব্র্যান্ড ভ্যালুর ছড়াছড়ি, সেখানে ভারতের ঝাড়খণ্ডের চাইবাসার এই 'রঙ্গিলা স্টার তিরিলবাসা' ফুটবল টুর্নামেন্ট ক্রীড়াবিশ্বের সামনে এক অন্যরকম ও সরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এখানে মেসি, রোনালদো বা বিশ্বসেরা ‘গোট’ (GOAT) নির্ধারণের কোনো আগ্রাসী বিতর্ক নেই, বরং গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে এই বাস্তব ‘গোট’ বা খাসিই হলো তাদের ঐক্যের প্রতীক এবং উৎসবের মূল প্রাণ। এই আদিবাসী ফুটবল টুর্নামেন্ট আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, খেলার আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে মানুষের সাথে মানুষের সম্প্রীতি ও আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মাঝেই।