এশিয়া

নয়া দিল্লিতে পার্লামেন্ট ঘেরাও কর্মসূচি স্থগিত করল 'ককরোচ' জনতা পার্টি

ভারতের চিকিৎসা বিজ্ঞানে ভর্তির প্রবেশিকা পরীক্ষা 'নিট' (NEET-UG)-এর নজিরবিহীন প্রশ্নফাঁস এবং শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপক দুর্নীতির প্রতিবাদে গড়ে ওঠা তরুণ-নেতৃত্বাধীন 'ককরোচ জনতা পার্টি' (CJP)-এর পার্লামেন্ট অভিমুখী পদযাত্রা কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে।

১৪ বার পঠিত
নয়া দিল্লিতে পার্লামেন্ট ঘেরাও কর্মসূচি স্থগিত করল 'ককরোচ' জনতা পার্টি
সোমবার (২০ জুলাই) ভারতের পার্লামেন্টের বর্ষাকালীন অধিবেশনের প্রথম দিনে নয়া দিল্লিতে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর মিছিলে পুলিশের বর্বরোচিত লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপের পর এই সিদ্ধান্ত নেয় সংগঠনটি। পুলিশি এই তাণ্ডবে শতাধিক শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হওয়ার পর, আন্দোলনকারীদের জীবনের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে রাজপথের এই ঘেরাও কর্মসূচি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনের নেতারা। তবে তারা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগসহ মূল দাবিগুলো আদায় না হওয়া পর্যন্ত তাদের এই সরকারবিরোধী সংগ্রাম ও অবস্থান কর্মসূচি জন্তর মন্তরে অব্যাহত থাকবে।

গত মে মাসে শুরু হওয়া এই ছাত্র আন্দোলন মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে রাজপথে নেমে আসে এবং সোমবার তা এক চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে। নয়া দিল্লির রাজপথে শিক্ষার্থীদের এই বিক্ষোভ এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাপ্রবাহ ও এর পেছনের কারণগুলো বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিকে নির্দেশ করে:

ব্যাপক পুলিশি হামলা ও হতাহতের পরিসংখ্যান: সোমবার প্রায় ১০ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশী তরুণ নয়া দিল্লির কেন্দ্রস্থলে জমায়েত হয়ে পার্লামেন্ট ভবনের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে তাদের বাধা দেয় এবং একপর্যায়ে নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর বেপরোয়া লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ও ছাত্রনেতা অভিজিৎ দীপকের দাবি অনুযায়ী, পুলিশের এই হামলায় অন্তত ১৫০ জন আন্দোলনকারী আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। অন্যদিকে, দিল্লি পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, আন্দোলনকারীরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে উগ্র আচরণ করেছিল। পুলিশের ভাষ্যমতে, সংঘর্ষে প্রায় ১৮০ জন আহত হয়েছেন, যার মধ্যে ১১৮ জনই পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মী এবং ৬০ জন আন্দোলনকারী। এছাড়া, ঘটনাস্থল থেকে অন্তত ৭০ জন বিক্ষোভকারীকে আটক করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।

নেতৃত্বের প্রতিক্রিয়া ও কর্মসূচি স্থগিতের ঘোষণা: রাজপথে শিক্ষার্থীদের রক্ত ঝরার পর মঙ্গলবার (২১ জুলাই) এক আবেগঘন বার্তায় পার্লামেন্ট ঘেরাওয়ের মতো আর কোনো পদযাত্রা না করার ঘোষণা দেন সিজেপি নেতা অভিজিৎ দীপকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে তিনি আহত শিক্ষার্থীদের, বিশেষ করে পুরুষ পুলিশ সদস্যদের দ্বারা নির্মমভাবে প্রহৃত নারী শিক্ষার্থীদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তিনি বলেন, "আমরা আরও ভালোভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারতাম। আমাদের তরুণদের রক্ত ঝরাতে সরকার দ্বিধা করছে না, তবে আমরা চাই না আমাদের আর কোনো ভাই-বোনের প্রাণহানি বা রক্তপাত হোক। তাই আমরা আর কোনো পদযাত্রা করব না, তবে আমাদের লড়াই চলবে"।

আন্দোলনকারীদের সুনির্দিষ্ট দাবিসমূহ: ককরোচ জনতা পার্টির এই চলমান আন্দোলনের মূল দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—নিট প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারির সম্পূর্ণ দায়ভার নিয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অবিলম্বে পদত্যাগ, এই দুর্নীতির কারণে হতাশাগ্রস্ত হয়ে আত্মহত্যা করা ১২ থেকে ২০ জন শিক্ষার্থীর পরিবারকে মাথাপিছু ১ কোটি রুপি করে ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং অনশনরত সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকের নিঃশর্ত মুক্তি। পুলিশ জোরপূর্বক সোনম ওয়াংচুককে জন্তর মন্তরের আন্দোলনস্থল থেকে তুলে নিয়ে হাসপাতালে বন্দি করে রাখায় আন্দোলনকারীদের ক্ষোভ আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে, যা তারা "বেআইনি আটক" হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

এই তীব্র বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মূলে রয়েছে ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার সাম্প্রতিককালের সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারি। চলতি বছরের মে মাসে অনুষ্ঠিত ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট বা 'নিট' (NEET) পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস এবং সেন্ট্রাল বোর্ড অফ সেকেন্ডারি এডুকেশনের (CBSE) অন-স্ক্রিন মার্কিংয়ে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এই প্রবেশিকা পরীক্ষার ওপর ভিত্তি করে ভারতের প্রায় ২২ লাখ স্বপ্নবাজ শিক্ষার্থী মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পান। কিন্তু দুর্নীতি ও প্রশ্নফাঁসের কারণে পুরো পরীক্ষা প্রক্রিয়াটি আস্থার সংকটে পড়ে এবং লাখ লাখ তরুণের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পতিত হয়। এই চরম হতাশা থেকে অন্তত ১২ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। এই নিট কেলেঙ্কারি ভারতের বেকার ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন তরুণ সমাজের মনে দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভের বারুদে অগ্নিসংযোগ করে।

তবে এই আন্দোলনের 'ককরোচ জনতা পার্টি' বা 'তেলাপোকা' নামকরণের পেছনের ইতিহাস আরও বেশি কৌতূহলোদ্দীপক এবং একই সাথে অবমাননাকর এক মন্তব্যের ফসল। ২০২৬ সালের মে মাসে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একটি শুনানিকালে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত সরকারের সমালোচক, বেকার তরুণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাক্টিভিস্টদের 'তেলাপোকা' (Cockroaches) এবং 'পরজীবী' (Parasites) বলে কটাক্ষ করেছিলেন। দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয় থেকে আসা এই অবমাননাকর মন্তব্য তরুণ সমাজকে গভীরভাবে আহত করে। কিন্তু তারা দমে না গিয়ে এই গালিকেই নিজেদের শক্তি ও আত্মপরিচয়ের হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করে। মাত্র ৭৮ ঘণ্টার মধ্যে ইনস্টাগ্রামে 'ককরোচ জনতা পার্টি' নামে একটি ব্যঙ্গাত্মক (Satirical) পেজ খোলা হয়, যা খুব দ্রুত ২ কোটি ২৫ লাখ (২২.৫ মিলিয়ন) ফলোয়ার অর্জন করে। তরুণরা এই বার্তা দিতে শুরু করে যে, "তেলাপোকাকে কেউ ভয় পায় না, আর তেলাপোকা সহজে মরেও না"। এভাবেই একটি অনলাইন ট্রল বা ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদ ধীরে ধীরে নয়া দিল্লি, পুনে, বেঙ্গালুরু এবং লখনউয়ের রাজপথে ভারতের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ ছাত্র আন্দোলনে রূপ নেয়।

সোমবারের এই পুলিশি ক্র্যাকডাউনের পর ভারতের জাতীয় রাজনীতিতেও এর তীব্র ঢেউ আছড়ে পড়েছে। প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্র এবং সমাজবাদী পার্টির শীর্ষ নেতারা আহত শিক্ষার্থীদের দেখতে দিল্লির রাম মনোহর লোহিয়া (আরএমএল) হাসপাতালে ছুটে যান। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিট প্রশ্নফাঁসকে দেশের তরুণদের প্রতি একটি "মহা পাপ" হিসেবে আখ্যায়িত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। এদিকে ভারতের সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু আলোচনা ইতিবাচক দিকে এগোচ্ছে বলে দাবি করে এই মুহূর্তে আন্দোলনকারীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।

বর্তমানে দিল্লির ঐতিহাসিক জন্তর মন্তরে আন্দোলনকারীরা পুনরায় তাদের ছেঁড়া তাঁবু জোড়া লাগাতে শুরু করেছেন এবং নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করার জন্য রাস্তা ঝাড়ু দিয়ে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন। রাজপথের সহিংস পদযাত্রা স্থগিত হলেও, তরুণদের এই 'তেলাপোকা বিপ্লব' মোদি সরকারের জন্য একটি সুস্পষ্ট বার্তা রেখে গেছে—ভারতের বেকারত্ব, দুর্নীতিগ্রস্ত শিক্ষাব্যবস্থা এবং সরকারি জবাবদিহিহীনতার বিরুদ্ধে তরুণ সমাজ আর চুপ করে বসে থাকবে না। দমনপীড়ন করে সাময়িকভাবে মিছিল থামানো গেলেও, শিক্ষার্থীদের বুকে জ্বলে ওঠা পরিবর্তনের এই আগুন ভারতের আগামী দিনের রাজনৈতিক গতিপথকে গভীরভাবে প্রভাবিত করবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।