ভূ রাজনীতি ও কূটনীতি

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে নেতৃত্বের রদবদল: জেনারেলদের বরখাস্তের কারণ ও প্রভাব

রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপে সমন্বয়, রাজনৈতিক সমীকরণ এবং যুদ্ধক্ষেত্রের ব্যর্থতার দায়ে দুই দেশের সামরিক বাহিনীতেই দফায় দফায় শীর্ষ কমান্ডার ও জেনারেলদের বরখাস্ত করার ঘটনা ঘটেছে।

৪ বার পঠিত
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে নেতৃত্বের রদবদল: জেনারেলদের বরখাস্তের কারণ ও প্রভাব
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সম্প্রতি তাঁর প্রধান সেনাপতি আলেকজান্ডার সিরস্কিকে (Oleksandr Syrskii) পদচ্যুত করার পর দুই দেশের সামরিক নেতৃত্বের পরিবর্তন ও অভ্যন্তরীণ সংকট আবারো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। রাজধানী কিয়েভে ব্যাপক বিক্ষোভ ও রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে নেওয়া এই সিদ্ধান্তটি চার বছরের যুদ্ধকালীন নীতিতে অন্যতম বড় ধরনের রদবদল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

৬০ বছর বয়সী জেনারেল আলেকজান্ডার সিরস্কি ছিলেন ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীর অন্যতম অভিজ্ঞ ও পরিচিত মুখ। ১৯৬৫ সালে সাবেক সোভিয়েত রাশিয়ায় জন্ম নেওয়া সিরস্কি মস্কোর রেড আর্মি একাডেমিতে শিক্ষা লাভ করেন এবং পরবর্তীতে কিয়েভের ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা শেষ করে স্বাধীন ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ২০১৪ সালে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় দোনেৎস্ক অঞ্চলে মস্কো সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তিনি নেতৃত্ব দেন। ২০১৯ সালে ইউক্রেনের পদাতিক বাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার পূর্ণ মাত্রার আক্রমণ শুরু হলে তিনি রাজধানী কিয়েভ সুরক্ষার মূল রূপকার ছিলেন। সফল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য তাকে ইউক্রেনের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা "হিরো অফ ইউক্রেন" প্রদান করা হয়। এছাড়া ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে খারকিভ অঞ্চলে সফল পাল্টা আক্রমণের নেতৃত্ব দিয়ে কুপিয়ানস্ক ও ইজিয়াম শহর পুনরুদ্ধার করা ছিল সিরস্কির অন্যতম বড় সাফল্য।

তবে আলেকজান্ডার সিরস্কিকে পদচ্যুত করার পেছনের প্রেক্ষাপটটি কেবল সামরিক ভূমিকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এর ঠিক এক সপ্তাহ আগে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী মাইখাইলো ফেদোরোভকে (Mykhailo Fedorov) পদচ্যুত করেন প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি। ফেদোরোভ ছিলেন ইউক্রেনের যুদ্ধ প্রচেষ্টায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় একজন ব্যক্তিত্ব, যার সাথে সেনাপ্রধান সিরস্কির দীর্ঘদিন ধরে মতবিরোধ চলছিল। জনপ্রিয় প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে সরিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে কিয়েভের রাজপথে টানা ছয় দিন ধরে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ ও সামরিক সমর্থকেরা বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট সামাল দিতে এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় নতুন গতি আনতে শেষ পর্যন্ত সেনাপ্রধান সিরস্কিকেও তার পদ থেকে অপসারণ করতে বাধ্য হন জেলেনস্কি।

যুদ্ধের দীর্ঘ চার বছরে ইউক্রেনীয় বাহিনীতে শীর্ষ সেনাপতি পরিবর্তনের ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এর আগে প্রখ্যাত সেনাপ্রধান ভ্যালেরি জালুঝনিকেও (Valerii Zaluzhnyi) দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন জেলেনস্কি, যা সে সময় ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনী ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। শুধু সেনাপ্রধানই নন, গত কয়েক বছরে ইউক্রেনের যৌথ বাহিনী, রিজার্ভ ফোর্স, এয়ারবোর্ন এবং পদাতিক বাহিনীর প্রধানসহ প্রায় ১৫ জনেরও বেশি উচ্চপদস্থ সামরিক জেনারেল এবং চিকিৎসাবিভাগের কমান্ডারের পদায়ন ও অপসারণ ঘটিয়েছেন জেলেনস্কি। যুদ্ধক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না পাওয়া, পশ্চিমা সামরিক সহায়তায় বিলম্ব, সামরিক দুর্নীতি এবং ব্যবস্থাপনার জটিলতাই ছিল এই ব্যাপক রদবদলের মূল কারণ।

অন্যদিকে, যুদ্ধক্ষেত্রে আশানুরূপ অগ্রগতি না হওয়ায় রাশিয়ার ভেতরেও সামরিক শীর্ষ পদে বড় ধরনের রদবদল ও বরখাস্তের ঝড় বয়ে গেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন একাধিক শীর্ষ জেনারেল এবং আঞ্চলিক কমান্ডারকে পদচ্যুত করেছেন। যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে কিয়েভ দখলের ব্যর্থতা, পরবর্তীতে খারকিভ ও খেরসন থেকে রুশ বাহিনীর পিছু হটা এবং বিশাল সামরিক ক্ষতির কারণে জেনারেল সেভসেভসহ একাধিক জেনারেলকে বরখাস্ত করা হয়। এছাড়া ওয়াগনার গ্রুপের প্রধান ইয়েভগেনি প্রিগোজিনের সংক্ষিপ্ত বিদ্রোহের পর সেনাপ্রধান ভ্যালেরি জেরাসিমভ এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রী সের্গেই শোইগুর ভূমিকা নিয়ে রুশ রাজনীতিতে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়, যার ধারাবাহিকতায় রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রের কমান্ডিং অফিসারদের পদে ব্যাপক পরিবর্তন আনেন পুতিন।

রাশিয়া ও ইউক্রেন—উভয় দেশের সামরিক নেতৃত্বের এই ধারাবাহিক পরিবর্তন কেবল যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতির ওপরই নয়, দুই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও সামরিক কৌশলের ওপরও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলছে। উচ্চপর্যায়ের সেনাপতিদের ঘনঘন বরখাস্ত করা একদিকে যেমন দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধকৌশল বাস্তবায়নে বাধা তৈরি করছে, অন্যদিকে তা দুই দেশের সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে একধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। সামনের দিনগুলোতে নতুন সামরিক নেতৃত্ব কীভাবে এই জটিল রাজনৈতিক সংকট ও যুদ্ধক্ষেত্রের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে, তার ওপরই নির্ভর করছে যুদ্ধের মোড় এবং পূর্বাঞ্চলীয় ইউরোপের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা।