ভূ রাজনীতি ও কূটনীতি
ইসরায়েল নীতিতে ওয়াশিংটনের ঐতিহাসিক ফাটল: যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক দশকের দ্বিপক্ষীয় ঐকমত্যের সমাপ্তি
মধ্যপ্রাচ্যের নীতিতে বিশেষ করে ইসরায়েলকে নিঃশর্ত সামরিক সাহায্য এবং কূটনৈতিক সুরক্ষা প্রদান সম্পর্কিত যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক দশকের পুরোনো দ্বিপক্ষীয় ঐকমত্যে এক নজিরবিহীন ও ঐতিহাসিক ফাটল দেখা দিয়েছে।
সম্প্রতি মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে ইসরায়েলে সামরিক সহায়তা বন্ধ করার লক্ষ্যে আনা একটি সংশোধনী প্রস্তাবের পক্ষে ডেমোক্র্যাট দলের ১০০ জনেরও বেশি প্রতিনিধি ভোট প্রদান করায় ওয়াশিংটনের প্রথাগত রাজনীতিতে এক বড় ধরনের পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যদিও শেষ পর্যন্ত ডেমোক্র্যাটদের একটি অংশ এবং অধিকাংশ রিপাবলিকান সদস্যের যৌথ বিরোধিতায় প্রস্তাবটি পাস হতে পারেনি, তবে এই ভোটাভুটি মার্কিন আইনসভায় ইসরায়েলের ঐতিহাসিক একচ্ছত্র প্রভাব ও জবাবদিহীহীন সুরক্ষার দেওয়ালে বড় ধরনের ফাটল ধরিয়ে দিয়েছে।
কয়েক দশক ধরে ওয়াশিংটনের রাজনীতিতে ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা দেওয়া ছিল একটি অলিখিত এবং অনড় জাতীয় নীতি। ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় রাজনৈতিক দল, শক্তিশালী ইসরায়েলপন্থী লবিং সংস্থা এবং মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির নীতি-নির্ধারকেরা সমানভাবে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার কৌশলের মূল স্তম্ভ হিসেবে ইসরায়েলের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে আসছিলেন। সেই সময়ে মার্কিন কংগ্রেসে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলো নিয়ে কোনো জোরালো জবাবদিহিতার চর্চা ছিল না। তবে সাম্প্রতিক সময়ে অনুষ্ঠিত প্রতিনিধি পরিষদের এই বিতর্কিত ভোট প্রমাণ করে যে, এই প্রতিষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা আর কোনোভাবেই অপরিবর্তনীয় বা চিরস্থায়ী নয়।
মার্কিন রাজনীতির এই গুণগত পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত হলো সাবেক স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত। বিগত কয়েক দশক ধরে ন্যান্সি পেলোসি মার্কিন রাজনীতিতে ইসরায়েলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত ডেমোক্র্যাট সহযোগীদের একজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অথচ তিনিও তার দলের ১০০ জনেরও বেশি সদস্যের সঙ্গে যোগ দিয়ে ইসরায়েলে মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। ন্যান্সি পেলোসি প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছেন যে, সাধারণ মার্কিন নাগরিকেরা যুদ্ধ ও সহিংসতার এক অসীম ও স্থায়ী চক্রের অবসান দেখতে চায়। তার এই অবস্থান পরিবর্তন এটিই প্রমাণ করে যে, ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মূল ভোটার ভিত্তি গভীরভাবে বদলে গেছে এবং দলীয় নেতৃত্ব এখন আর ইসরায়েল সংক্রান্ত পুরোনো প্রথাগত আনুগত্য ধরে রাখতে পারছে না।
যদিও এই রাজনৈতিক রূপান্তরটি মার্কিন রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় ধরে ভেতরে ভেতরে পুঞ্জীভূত হচ্ছিল, তবে গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযান ও সেখানে সৃষ্ট অভূতপূর্ব মানবিক বিপর্যয় একে একটি চূড়ান্ত মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছে। গাজা সংকটের বহুকাল আগে থেকেই অনেক ডেমোক্র্যাট সদস্য পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ, ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনে শান্তি প্রক্রিয়ার পতন এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর চরমপন্থী ডানপন্থীদের সঙ্গে জোট গঠনের নীতি নিয়ে চরম অস্বস্তিতে ছিলেন। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রগতিশীল অংশের চোখে ইসরায়েল ধীরে ধীরে একটি অনিবার্য কৌশলগত মিত্র থেকে মার্কিন রাজনীতি ও নৈতিকতার ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের ঝুঁকিতে পরিণত হতে শুরু করে।
গাজা যুদ্ধ এই অসন্তোষ ও অস্বস্তিকে এক নজিরবিহীন জনদাবিতে রূপান্তরিত করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে গাজার নজিরবিহীন ধ্বংসযজ্ঞ এবং নিরীহ বেসামরিক মানুষের করুণ পরিণতি বিশ্বজুড়ে সরাসরি ছড়িয়ে পড়ার ফলে ডেমোক্র্যাট সমর্থকদের ভেতরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ তীব্র জবাবদিহিতার দাবিতে পরিণত হয়। ফলে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা নিরবতা ভেঙে সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে মূলধারার রাজনীতিকেরা পর্যন্ত ইসরায়েলি নীতি পুনর্মূল্যায়নের জোর দাবি তুলতে শুরু করেন।
মার্কিন রাজনীতির এই ঐতিহাসিক রূপান্তরের সূচনা মূলত ওয়াশিংটনের ক্যাপিটল হিল থেকে হয়নি; বরং এর গোড়াপত্তন হয়েছিল আমেরিকার ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্যাম্পাস থেকে। গাজায় যুদ্ধ শুরুর প্রথম কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই কোলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে ইউসিএলএ (UCLA) পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব ও পশ্চিম উপকূলের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীরা একটি অভূতপূর্ব আন্দোলন গড়ে তোলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে তাবু খাটিয়ে অবস্থান কর্মসূচি, মুক্ত আলোচনা ও বিক্ষোভ প্রদর্শনের মাধ্যমে তরুণ শিক্ষার্থীরা গাজা ইস্যুটিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম কেন্দ্রীয় বিষয়ে পরিণত করে। এটি কেবল একটি সাময়িক বিক্ষোভ ছিল না, বরং ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ঐতিহ্যবাহী ইসরায়েল নীতির বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্মের এক বিশাল কাঠামোগত বিদ্রোহ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এই পরিবর্তনের গভীরতা ও বার্তা উপলব্ধি করতে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নীতি-নির্ধারকেরা বড় ধরনের ব্যর্থতার পরিচয় দেন। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সাথে সংলাপে বসার পরিবর্তে ডেমোক্র্যাট দলীয় অনেক প্রবীণ নেতা শিক্ষার্থীদের এই প্রতিবাদ দমনে কঠোর প্রশাসনিক অবস্থান গ্রহণ ও পুলিশি পদক্ষেপের পক্ষে সাফাই গান। আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে ডেমোক্র্যাট সমর্থকদের চোখের সামনে শত শত শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদী শিক্ষার্থীকে গ্রেফতার, বহিষ্কার এবং জোরপূর্বক সরিয়ে দেওয়ার দৃশ্য তরুণ ভোটারদের ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ করে তোলে। এর ফলে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির তরুণ প্রগতিশীল ভোটাররা নিজেদের দলীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত থেকে মানসিকভাবে দূরে সরে যেতে বাধ্য হয় এবং দলের ভেতরের অভ্যন্তরীণ ঐক্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
মার্কিন রাজনীতিতে এই বিভ্রান্তি ও অসন্তোষের প্রভাব খুব দ্রুত নির্বাচনী ফলাফলে দৃশ্যমান হয়। নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি কেবল মার্কিন প্রেসিডেন্ট দৌড়েই পরাজিত হয়নি, বরং মার্কিন সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পাশাপাশি প্রতিনিধি পরিষদেও বেশ কয়েকটি আসন হাতছাড়া করে। যদিও ডেমোক্র্যাটদের এই ভরাডুবির পেছনে গাজা সংকটই একমাত্র কারণ ছিল না, তবে এটি পরিষ্কার করে দেয় যে দলীয় নেতৃত্ব যখন তাদের নিজস্ব প্রগতিশীল ভোটাধিকারীদের মতামতকে অবমূল্যায়ন করে, তখন তার পরিণতি কতটা গুরুতর হতে পারে। তরুণদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা আন্দোলনকে ধামাচাপা দিতে পারেনি, বরং ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অভ্যন্তরে ইসরায়েল নীতি পুনর্মূল্যায়নের প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করে তুলেছিল।
সম্প্রতি মার্কিন রাজনৈতিক দৃশ্যপটে প্রগতিশীল প্রার্থীরা ইসরায়েলকে নিঃশর্ত সামরিক সাহায্য দেওয়ার বিরোধিতা করে এবং শক্তিশালী ইসরায়েলপন্থী লবিং সংস্থাগুলোর রাজনৈতিক অনুদান প্রত্যাখ্যান করে একের পর এক দলীয় প্রাথমিক নির্বাচনে (Primaries) জয়লাভ করছেন। এই ধারাবাহিক বিজয়গুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, ডেমোক্র্যাটিক পার্টির রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন ইসরায়েলের অন্যায্য নীতির সমালোচনা করা আর কোনো রাজনৈতিক ঝুঁকি নয়, বরং বহু এলাকায় এটি নির্বাচনে জয়লাভের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
বর্তমানে রাজ্য ও ফেডারেল উভয় পর্যায়ের ডেমোক্র্যাট আইন প্রণেতারা প্রকাশ্যে ইসরায়েলে পাঠানো অর্থ ও অস্ত্রের শর্তযুক্তকরণ, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, আন্তর্জাতিক আইন মান্য করা এবং আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতিকে পুনর্গঠনের দাবি তুলছেন। মার্কিন রাজনীতিতে একসময় যে বিষয়গুলো চরম প্রান্তিক ও নিষিদ্ধ রাজনৈতিক আলোচনা হিসেবে গণ্য হতো, আজ তা মার্কিন কংগ্রেসের মূল আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এখন আর মূল প্রশ্নটি এটি নয় যে ওয়াশিংটন ইসরায়েলকে সমর্থন করবে কিনা; বরং প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে—সেই সমর্থনের শর্তগুলো কী হবে এবং ওয়াশিংটন অন্যান্য বিশ্বস্ত মিত্রদের ক্ষেত্রে মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের যে মানদণ্ড প্রয়োগ করে, ইসরায়েলকে কেন সেই মানদণ্ডের বাইরে বিশেষ সুবিধা প্রদান করা হবে।
এই পুরো প্রক্রিয়ার মূল নির্যাস হলো—আমেরিকা ও ইসরায়েলের সুদীর্ঘ সুসম্পর্কের মধ্যে এক প্রজন্মগত ও রাজনৈতিক পুনর্গঠন ঘটে গেছে। যদিও মার্কিন কংগ্রেসে এখনো ইসরায়েলে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা অব্যাহত রাখার মতো পর্যাপ্ত ভোট রয়েছে, তবে যে দ্বি-দলীয় রাজনৈতিক ঐকমত্য এই সহায়তাকে একসময় আইনসভায় স্বয়ংক্রিয় ও প্রশ্নাতীত করে রেখেছিল, সেই ঐকমত্যের মূল ভিত্তি এখন সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। প্রতিনিধি পরিষদে সম্প্রতি শেষ হওয়া এই ভোটাভুটির তাৎপর্য কেবল একটি বিল বা সংশোধনী পাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি আমেরিকার ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতির স্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করে।
ইসরায়েলের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী এবং কৌশলগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। বিগত কয়েক দশক ধরে ইসরায়েলের প্রতিটি সরকার তাদের জাতীয় নিরাপত্তা ও সামরিক কৌশল এই বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করেছিল যে, মার্কিন সামরিক ও কূটনৈতিক সমর্থন সর্বদা দ্বি-দলীয় ও নিঃশর্ত থাকবে। প্রতি বছর আমেরিকা থেকে পাওয়া বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা ব্যবহার করে ইসরায়েল সর্বাধুনিক যুদ্ধবিমান, মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম এবং অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র তৈরি ও ক্রয় করে আসছে, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে মূল ভূমিকা পালন করে।
যদি ওয়াশিংটনে ইসরায়েলের প্রতি দ্বি-দলীয় এই ঐকমত্য ক্রমাগত ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে, তবে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তার এই সুদীর্ঘ ভিত্তি চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে। ভবিষ্যতে ডেমোক্র্যাট নেতৃত্বাধীন সরকার কিংবা কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা তৈরি হলে তারা হয়তো ইসরায়েলে সামরিক সহায়তা একবারে পুরোপুরি বন্ধ করবে না, তবে বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা, আন্তর্জাতিক আইনের অনুশাসন মান্য করা, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অবৈধ বসতি নির্মাণ বন্ধ এবং ত্রাণ কার্যক্রমে বাধা না দেওয়ার মতো কঠোর শর্তাবলি আরোপ করবে।
এর ফলে ইসরায়েল কেবল দীর্ঘমেয়াদী সামরিক পরিকল্পনার নিশ্চয়তাই হারাবে না, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ওয়াশিংটনের যে অন্ধ কূটনৈতিক সুরক্ষা ইসরায়েল পেয়ে আসছিল, তা-ও ক্রমান্বয়ে শিথিল হয়ে আসবে। ভবিষ্যতে যেকোনো সামরিক বা রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণের আগে ইসরায়েলি নীতিনির্ধারকদের কেবল তাদের নিজস্ব সামরিক সমীকরণের কথা ভাবলেই চলবে না, বরং ওয়াশিংটনের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক অসন্তোষ ও শর্তাবলির পরিণতিও সমানভাবে হিসেব করতে হবে। মার্কিন রাজনীতির তলদেশে তৈরি হওয়া এই ফাটল হয়তো অদূর ভবিষ্যতে ওয়াশিংটন-তেল আবিব মিত্রতার সমাপ্তি ঘটাবে না, তবে এই সম্পর্ককে পুরোপুরি 'শর্তসাপেক্ষ' এক নতুন যুগে প্রবেশ করাবে, যা আধুনিক ইসরায়েলি ইতিহাসের অন্যতম প্রধান কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
কয়েক দশক ধরে ওয়াশিংটনের রাজনীতিতে ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা দেওয়া ছিল একটি অলিখিত এবং অনড় জাতীয় নীতি। ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় রাজনৈতিক দল, শক্তিশালী ইসরায়েলপন্থী লবিং সংস্থা এবং মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির নীতি-নির্ধারকেরা সমানভাবে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার কৌশলের মূল স্তম্ভ হিসেবে ইসরায়েলের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে আসছিলেন। সেই সময়ে মার্কিন কংগ্রেসে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলো নিয়ে কোনো জোরালো জবাবদিহিতার চর্চা ছিল না। তবে সাম্প্রতিক সময়ে অনুষ্ঠিত প্রতিনিধি পরিষদের এই বিতর্কিত ভোট প্রমাণ করে যে, এই প্রতিষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা আর কোনোভাবেই অপরিবর্তনীয় বা চিরস্থায়ী নয়।
মার্কিন রাজনীতির এই গুণগত পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত হলো সাবেক স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত। বিগত কয়েক দশক ধরে ন্যান্সি পেলোসি মার্কিন রাজনীতিতে ইসরায়েলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত ডেমোক্র্যাট সহযোগীদের একজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অথচ তিনিও তার দলের ১০০ জনেরও বেশি সদস্যের সঙ্গে যোগ দিয়ে ইসরায়েলে মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। ন্যান্সি পেলোসি প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছেন যে, সাধারণ মার্কিন নাগরিকেরা যুদ্ধ ও সহিংসতার এক অসীম ও স্থায়ী চক্রের অবসান দেখতে চায়। তার এই অবস্থান পরিবর্তন এটিই প্রমাণ করে যে, ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মূল ভোটার ভিত্তি গভীরভাবে বদলে গেছে এবং দলীয় নেতৃত্ব এখন আর ইসরায়েল সংক্রান্ত পুরোনো প্রথাগত আনুগত্য ধরে রাখতে পারছে না।
যদিও এই রাজনৈতিক রূপান্তরটি মার্কিন রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় ধরে ভেতরে ভেতরে পুঞ্জীভূত হচ্ছিল, তবে গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযান ও সেখানে সৃষ্ট অভূতপূর্ব মানবিক বিপর্যয় একে একটি চূড়ান্ত মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছে। গাজা সংকটের বহুকাল আগে থেকেই অনেক ডেমোক্র্যাট সদস্য পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ, ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনে শান্তি প্রক্রিয়ার পতন এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর চরমপন্থী ডানপন্থীদের সঙ্গে জোট গঠনের নীতি নিয়ে চরম অস্বস্তিতে ছিলেন। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রগতিশীল অংশের চোখে ইসরায়েল ধীরে ধীরে একটি অনিবার্য কৌশলগত মিত্র থেকে মার্কিন রাজনীতি ও নৈতিকতার ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের ঝুঁকিতে পরিণত হতে শুরু করে।
গাজা যুদ্ধ এই অসন্তোষ ও অস্বস্তিকে এক নজিরবিহীন জনদাবিতে রূপান্তরিত করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে গাজার নজিরবিহীন ধ্বংসযজ্ঞ এবং নিরীহ বেসামরিক মানুষের করুণ পরিণতি বিশ্বজুড়ে সরাসরি ছড়িয়ে পড়ার ফলে ডেমোক্র্যাট সমর্থকদের ভেতরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ তীব্র জবাবদিহিতার দাবিতে পরিণত হয়। ফলে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা নিরবতা ভেঙে সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে মূলধারার রাজনীতিকেরা পর্যন্ত ইসরায়েলি নীতি পুনর্মূল্যায়নের জোর দাবি তুলতে শুরু করেন।
মার্কিন রাজনীতির এই ঐতিহাসিক রূপান্তরের সূচনা মূলত ওয়াশিংটনের ক্যাপিটল হিল থেকে হয়নি; বরং এর গোড়াপত্তন হয়েছিল আমেরিকার ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্যাম্পাস থেকে। গাজায় যুদ্ধ শুরুর প্রথম কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই কোলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে ইউসিএলএ (UCLA) পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব ও পশ্চিম উপকূলের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীরা একটি অভূতপূর্ব আন্দোলন গড়ে তোলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে তাবু খাটিয়ে অবস্থান কর্মসূচি, মুক্ত আলোচনা ও বিক্ষোভ প্রদর্শনের মাধ্যমে তরুণ শিক্ষার্থীরা গাজা ইস্যুটিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম কেন্দ্রীয় বিষয়ে পরিণত করে। এটি কেবল একটি সাময়িক বিক্ষোভ ছিল না, বরং ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ঐতিহ্যবাহী ইসরায়েল নীতির বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্মের এক বিশাল কাঠামোগত বিদ্রোহ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এই পরিবর্তনের গভীরতা ও বার্তা উপলব্ধি করতে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নীতি-নির্ধারকেরা বড় ধরনের ব্যর্থতার পরিচয় দেন। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সাথে সংলাপে বসার পরিবর্তে ডেমোক্র্যাট দলীয় অনেক প্রবীণ নেতা শিক্ষার্থীদের এই প্রতিবাদ দমনে কঠোর প্রশাসনিক অবস্থান গ্রহণ ও পুলিশি পদক্ষেপের পক্ষে সাফাই গান। আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে ডেমোক্র্যাট সমর্থকদের চোখের সামনে শত শত শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদী শিক্ষার্থীকে গ্রেফতার, বহিষ্কার এবং জোরপূর্বক সরিয়ে দেওয়ার দৃশ্য তরুণ ভোটারদের ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ করে তোলে। এর ফলে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির তরুণ প্রগতিশীল ভোটাররা নিজেদের দলীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত থেকে মানসিকভাবে দূরে সরে যেতে বাধ্য হয় এবং দলের ভেতরের অভ্যন্তরীণ ঐক্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
মার্কিন রাজনীতিতে এই বিভ্রান্তি ও অসন্তোষের প্রভাব খুব দ্রুত নির্বাচনী ফলাফলে দৃশ্যমান হয়। নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি কেবল মার্কিন প্রেসিডেন্ট দৌড়েই পরাজিত হয়নি, বরং মার্কিন সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পাশাপাশি প্রতিনিধি পরিষদেও বেশ কয়েকটি আসন হাতছাড়া করে। যদিও ডেমোক্র্যাটদের এই ভরাডুবির পেছনে গাজা সংকটই একমাত্র কারণ ছিল না, তবে এটি পরিষ্কার করে দেয় যে দলীয় নেতৃত্ব যখন তাদের নিজস্ব প্রগতিশীল ভোটাধিকারীদের মতামতকে অবমূল্যায়ন করে, তখন তার পরিণতি কতটা গুরুতর হতে পারে। তরুণদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা আন্দোলনকে ধামাচাপা দিতে পারেনি, বরং ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অভ্যন্তরে ইসরায়েল নীতি পুনর্মূল্যায়নের প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করে তুলেছিল।
সম্প্রতি মার্কিন রাজনৈতিক দৃশ্যপটে প্রগতিশীল প্রার্থীরা ইসরায়েলকে নিঃশর্ত সামরিক সাহায্য দেওয়ার বিরোধিতা করে এবং শক্তিশালী ইসরায়েলপন্থী লবিং সংস্থাগুলোর রাজনৈতিক অনুদান প্রত্যাখ্যান করে একের পর এক দলীয় প্রাথমিক নির্বাচনে (Primaries) জয়লাভ করছেন। এই ধারাবাহিক বিজয়গুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, ডেমোক্র্যাটিক পার্টির রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন ইসরায়েলের অন্যায্য নীতির সমালোচনা করা আর কোনো রাজনৈতিক ঝুঁকি নয়, বরং বহু এলাকায় এটি নির্বাচনে জয়লাভের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
বর্তমানে রাজ্য ও ফেডারেল উভয় পর্যায়ের ডেমোক্র্যাট আইন প্রণেতারা প্রকাশ্যে ইসরায়েলে পাঠানো অর্থ ও অস্ত্রের শর্তযুক্তকরণ, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, আন্তর্জাতিক আইন মান্য করা এবং আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতিকে পুনর্গঠনের দাবি তুলছেন। মার্কিন রাজনীতিতে একসময় যে বিষয়গুলো চরম প্রান্তিক ও নিষিদ্ধ রাজনৈতিক আলোচনা হিসেবে গণ্য হতো, আজ তা মার্কিন কংগ্রেসের মূল আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এখন আর মূল প্রশ্নটি এটি নয় যে ওয়াশিংটন ইসরায়েলকে সমর্থন করবে কিনা; বরং প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে—সেই সমর্থনের শর্তগুলো কী হবে এবং ওয়াশিংটন অন্যান্য বিশ্বস্ত মিত্রদের ক্ষেত্রে মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের যে মানদণ্ড প্রয়োগ করে, ইসরায়েলকে কেন সেই মানদণ্ডের বাইরে বিশেষ সুবিধা প্রদান করা হবে।
এই পুরো প্রক্রিয়ার মূল নির্যাস হলো—আমেরিকা ও ইসরায়েলের সুদীর্ঘ সুসম্পর্কের মধ্যে এক প্রজন্মগত ও রাজনৈতিক পুনর্গঠন ঘটে গেছে। যদিও মার্কিন কংগ্রেসে এখনো ইসরায়েলে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা অব্যাহত রাখার মতো পর্যাপ্ত ভোট রয়েছে, তবে যে দ্বি-দলীয় রাজনৈতিক ঐকমত্য এই সহায়তাকে একসময় আইনসভায় স্বয়ংক্রিয় ও প্রশ্নাতীত করে রেখেছিল, সেই ঐকমত্যের মূল ভিত্তি এখন সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। প্রতিনিধি পরিষদে সম্প্রতি শেষ হওয়া এই ভোটাভুটির তাৎপর্য কেবল একটি বিল বা সংশোধনী পাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি আমেরিকার ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতির স্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করে।
ইসরায়েলের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী এবং কৌশলগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। বিগত কয়েক দশক ধরে ইসরায়েলের প্রতিটি সরকার তাদের জাতীয় নিরাপত্তা ও সামরিক কৌশল এই বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করেছিল যে, মার্কিন সামরিক ও কূটনৈতিক সমর্থন সর্বদা দ্বি-দলীয় ও নিঃশর্ত থাকবে। প্রতি বছর আমেরিকা থেকে পাওয়া বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা ব্যবহার করে ইসরায়েল সর্বাধুনিক যুদ্ধবিমান, মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম এবং অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র তৈরি ও ক্রয় করে আসছে, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে মূল ভূমিকা পালন করে।
যদি ওয়াশিংটনে ইসরায়েলের প্রতি দ্বি-দলীয় এই ঐকমত্য ক্রমাগত ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে, তবে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তার এই সুদীর্ঘ ভিত্তি চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে। ভবিষ্যতে ডেমোক্র্যাট নেতৃত্বাধীন সরকার কিংবা কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা তৈরি হলে তারা হয়তো ইসরায়েলে সামরিক সহায়তা একবারে পুরোপুরি বন্ধ করবে না, তবে বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা, আন্তর্জাতিক আইনের অনুশাসন মান্য করা, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অবৈধ বসতি নির্মাণ বন্ধ এবং ত্রাণ কার্যক্রমে বাধা না দেওয়ার মতো কঠোর শর্তাবলি আরোপ করবে।
এর ফলে ইসরায়েল কেবল দীর্ঘমেয়াদী সামরিক পরিকল্পনার নিশ্চয়তাই হারাবে না, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ওয়াশিংটনের যে অন্ধ কূটনৈতিক সুরক্ষা ইসরায়েল পেয়ে আসছিল, তা-ও ক্রমান্বয়ে শিথিল হয়ে আসবে। ভবিষ্যতে যেকোনো সামরিক বা রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণের আগে ইসরায়েলি নীতিনির্ধারকদের কেবল তাদের নিজস্ব সামরিক সমীকরণের কথা ভাবলেই চলবে না, বরং ওয়াশিংটনের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক অসন্তোষ ও শর্তাবলির পরিণতিও সমানভাবে হিসেব করতে হবে। মার্কিন রাজনীতির তলদেশে তৈরি হওয়া এই ফাটল হয়তো অদূর ভবিষ্যতে ওয়াশিংটন-তেল আবিব মিত্রতার সমাপ্তি ঘটাবে না, তবে এই সম্পর্ককে পুরোপুরি 'শর্তসাপেক্ষ' এক নতুন যুগে প্রবেশ করাবে, যা আধুনিক ইসরায়েলি ইতিহাসের অন্যতম প্রধান কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।